বরিশালে ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে আবাসন (হাউজিং) ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ হাওলাদারের অণ্ডকোষ চেপে চেক ও স্ট্যাম্পে সই নেওয়ার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু বিএনপির কোনো পদে নেই। তবে তিনি বিএনপির কর্মী বলে নিজেকে পরিচয় দিতেন।
গত ২৭ জুন (শনিবার) সন্ধ্যার পর সদর রোড অগ্রণী হাউজিং অফিসে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আজিজকে মারধর ও অণ্ডকোষ চেপে দুটি চেক ও দুটি স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়। আজিজ এ ঘটনার সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র গতকাল শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। আজ রোববার দুপুরে প্রধান অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগী আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিটু নগরের ৯ নং ওয়ার্ডের কাঠপট্ট্রি সড়কে স্থায়ী বাসিন্দা। বাসার অদূরে কোতোয়ালী থানার পূর্বপাশের সড়কে তার বাবা মো. শাহজাহানের ফার্মেসি ব্যবসা রয়েছে। বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। পুরো পরিবারই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। সৌদি প্রবাসী লিটু ২০১১ সালে দেশে ফিরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তবে লিটুর ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায়, গত ঈদে শুভেচ্ছা জানানো ব্যানারে পরিচয় দেওয়া লেখা হয়েছে- সাবেক ছাত্রনেতা, সাবেক সম্পাদক, বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সৌদি আরব শাখার সদস্য।
ওই ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ বরিশাল-৫ আসনের এমপি মজিবর রহমান সারওয়ার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের ছবি রয়েছে। সারওয়ারের বাসায় তার সঙ্গে দাঁড়ানো ও সোফায় বসা কয়েকটি ছবি এবং গত নির্বাচনকালীন প্রচারাভিযানের ছবিও রয়েছে।
আজ রোববার সন্ধ্যায় বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিটুর স্ত্রী মৌসুমী আক্তার লুবনা বলেন, লিটু অগ্রণী হাউজিংয়ের একজন পরিচালক। প্রতিষ্ঠান এমডি আজিজ অনেকের টাকা আত্মাসাৎ করেছেন। এ নিয়ে আগে থেকেই মামলা চলছে। টাকা দেওয়ার কথা বলে কয়েকবছর যাবৎ ঘুড়াচ্ছেন। অতিষ্ঠ হয়ে লিটুসহ কয়েকজন পরিচালক ওই কাণ্ড করেছেন। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে নেই। লিটু রাজনীতি করেন না বলে দাবি করেন তার স্ত্রী। ফেসবুকে তার দলীয় পরিচয় প্রসঙ্গ তোলা হলে বলেন, তিনি বিএনপির সমর্থন করেন মাত্র।
লিটুর রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, ‘তার কোনো পদ নেই। আগেও ছিল না। ভাইয়ের পরিচয়ে বিভিন্ন নেতাদের কাছে যান। তার কোনো অপকর্মের দায় দল নেবে না।’
গত ২৭ জুনের হামলার ঘটনায় ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা গেছে, আব্দুল আজিজের কক্ষে চারজন ব্যক্তি ঢোকেন। তখন ওই কক্ষে দু’জন অতিথি আজিজের সঙ্গে চা খাচ্ছিলেন। অতিথি দু’জনকে কক্ষ থেকে বের করে দেন আগতরা। মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামক এক যুবক আজিজকে মারধর শুরু করেন। একপর্যাযে তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে দুটি চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্পে সই নেন।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মারধরের সময়ে আজিজ ‘বাচ্চু-বাচ্চু’ বলে ডাকাডাকি করেন। ডাক শুনে আরেক ব্যক্তি কক্ষের মধ্যে ঢুকলে লিটুর সঙ্গীরা ধাক্কাধাক্কি করে বের করে দেন। পরে চেক ও স্ট্যাম্প হস্তান্তরের ছবি তোলা হয়। ছবি তোলার সময়ে আজিজকে হাসতে বলা হয়।
ঘটনার শিকার আব্দুল আজিজ জানান, লিটু এক সময়ে আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। তার বিনিয়োগের বিপরীতে তিনি জমি নিয়ে বিক্রি করেছেন। প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা পাওনা নেই-এমন অঙ্গীকারনামাও দেওয়া হয়েছে। তারপরও লিটু তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তার কক্ষে ঢুকে তাকে মারধর করেছে। জোর করে ৭০ লাখ টাকার একটি চেক ও একটি সাদা চেক এবং সাদা দুটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
আজিজ জানান, ঘটনার পর পরই তিনি ব্যাংকে অভিযোগ দিয়ে রাখায় টাকা তুলে নিতে পারেননি। বৃহস্পতিবার নালিশি মামলাটি এফআইআরভুক্ত করতে আদালত কোতোয়ালী থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আজিজ স্বীকার করেন, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র শনিবার রাতে তিনিই প্রকাশ করেছেন।
ঘটনার কথা স্বীকার করে অভিযুক্ত লিটু জানান, যারা গিয়েছিলেন তারা সবাই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। আজিজ সবার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পাওনা টাকা আদায়ে তিনি এ কাজ করেছেন।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ আজ বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে জানান, সকাল ৭টার দিকে ভিডিওটি তাদের নজরে আসে। বেলা ২টার দিকে সদর রোড চেইন শপ ‘টপ টেন’- এর সামনে থেকে লিটু ও আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করা হয়।





































































































