নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের ঘোষণা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাদানীনগর এলাকায় এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, তাঁর কাছে মাদকসংক্রান্ত অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। তিনি বলেন, ‘কাল থেকে অভিযান শুরু হবে এবং এই এলাকা মাদকমুক্ত হবে। সুতরাং যারা মাদক কারবারি, তারা হুঁশিয়ার হয়ে যান।’
মসজিদ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, এলাকায় অনেক আলেম রয়েছেন। তাঁরা যেন মসজিদ ও মাদরাসায় বয়ানের সময় মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের কথা তুলে ধরেন এবং মানুষকে মাদকবিরোধী সচেতন করেন।
সভায় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না পেলে মাদকসেবী ও কারবারিদের টিকে থাকা কঠিন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যারা সরকারি দলের সঙ্গে আছি এবং রাজনীতি করি, যদি আমাদের কাছে মাদকসেবীরা আশ্রয় না পায়, তারা কিন্তু টিকতে পারবে না।’ তিনি সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জসহ সব এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে এমপি মান্নান বলেন, ‘আপনারাই কিন্তু সবচেয়ে বেশি এই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। দয়া করে মাদক থেকে এ দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত করে দেন।’
তিনি আরও বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় কে মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে তাঁর ধারণা রয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার আগেও তিনি এ এলাকায় নিয়মিত এসেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সবই আমি জানি এবং চিনি। এবার অনুরোধ করছি, এরপরে কিন্তু রেহাই পাবেন না।’
জেলা প্রশাসক(ডিসি) মো. রায়হান কবির বলেন, মাদকের সঙ্গে কিছু ব্যবসায়ী জড়িত, যারা এলাকায় মাদক নিয়ে আসেন। আবার স্থানীয় কিছু মানুষও মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মাদক প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক(ডিসি) বলেন, ‘আমার সন্তান মাদকাসক্ত, আমার ভাতিজা, আমার ভাগিনা বা পরিবারের কোনো সদস্য মাদকাসক্ত—তাদের মাদক থেকে দূরে রাখার একটা কাজ ঘরের ভেতর থেকেই করতে হবে। ঘরের শত্রুর সঙ্গে লড়াই করা কঠিন।’
তিনি বলেন, বাইরে থেকে আসা মাদক কারবারিদের পুলিশ ধরে শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু পরিবারের সদস্য বা পরিচিতদের মধ্যে যারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত মানুষের তুলনায় মাদকের বিরুদ্ধে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁর দাবি, এলাকার ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ মাদকের সঙ্গে জড়িত। বাকি ৯৮ শতাংশ মানুষ মাদকের বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, ‘এই দুই ভাগ মানুষ আমাদের ৯৮ ভাগ মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে কি ২ ভাগ মানুষের কাছে ৯৮ ভাগ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে? তারা জিম্মি হতে পারে না, ব্যর্থ হতে পারে না।’
মামুন মাহমুদ বলেন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাসহ সবাই চান সমাজ ও এলাকা মাদকমুক্ত হোক। ‘আমরা চাই সমাজ সুন্দরভাবে পরিচালিত হোক, আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিরাপদে বাসায় ফিরবে’—বলেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের নাম প্রকাশ করতে এখনো অনেকে ভয় পান। অনেকেই গোপনে নাম দিতে চান।
তিনি বলেন, ‘যতদিন গোপনে রাখবেন, তারা তত বেশি গোপনভাবে প্রভাবশালী হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। সে মাদক ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ্যে বলতে সমস্যা কী?’
রাজীব আরও বলেন, ‘তাদের সংখ্যা ২০ থেকে ১০০ জন হবে। এর বেশি কিন্তু এই এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী বা বিক্রেতা হতে পারে না। আপনারা হাজার হাজার মানুষ কেন গুটিকয়েক মানুষের নাম বলতে ভয় পান?’
তিনি বলেন, গোপনে নাম দেওয়া হলে অভিযুক্ত মাদক কারবারিরা নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বা ব্যক্তিগত শত্রুতার ফল হিসেবে দাবি করার সুযোগ পায়। তাই মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে প্রতিরোধের আহ্বান জানান তিনি।
এসময় সভায় উপস্থিত বক্তারা মাদকের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন।




































































































