ঢাকা ০৯:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু বার্ষিকী আজ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:১৯:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ জুন ২০২৪ ২১ বার পড়া হয়েছে
মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদায়ী সংবাদপাঠে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ..!
মানস বন্দ্যোপাধ্যায়,ভারত।।
১৯৭০ ও ১৯৭১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলি আজও মনে পড়ে। আমি একাধারে ছিলাম বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেষ কামাল, আওয়ামী লীগের প্রচার সচিব ঝন্টু সাহা ও এদিকে স্বনামধন্য সাংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
সারা পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন দখল করলেও পাকিস্তানি শাসক দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয় নি। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনের সময় বর্বর পাকিস্তানি সেনা বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অনেককে শহীদ করার পরই স্বাধনতার বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল। সেই বীজ থেকে গাছ মহীরুহী হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। বঞ্চনার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। অত্যাচারী পাকিস্তান বুলডোজার চালিয়ে হত্যা, গনধর্ষণ শুরু করলে কোটি কোটি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরায় চলে আসে। গর্জে ওঠে এপারের বাঙালিরাও। তারা আশ্রিতদের নিজেদের আত্মীয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন। চরম অত্যাচারের প্রতিবাদে ভারতের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সামরিক অভিযান চালান স্বাধীনতাকামীদের স্বার্থে। জয় বাংলা ধ্বনিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তি যোদ্ধারাও।
আকাশবাণী কলকাতা তখন সকলের আকর্ষণ বিন্দু। প্রতি মুহূর্তের রোমহর্ষক খবর দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও গোপনে একটি রেডিও আত্না প্রকাশ করে “রেডিও বাংলাদেশ” নামে আশু ঘোষের বাড়িতে। আমার তখন ঘনঘন যাতায়াত পার্ক সার্কাসে বাংলাদেশ মিশনে শেখ কামাল, ঝন্টু সাহা ও আকাশবাণী তে দেবদুলালের যাচ্ছে।
সেই উদাত্ত কণ্ঠে সংবাদ” আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। আজকের বিশেষ বিশেষ খবর হলো দুর্বার গতিতে ভারতীয় সেনা যশোর ক্যান্টনমেন্ট দখল করে এগিয়ে চলেছে। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর শহরে দুর্দান্ত লড়াইয়ে পাক সেনা লাহোর ছেড়ে পালিয়েছে। মুক্তি যোদ্ধারা বেশ কটি সেতু বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। নেতৃত্বে রয়েছেন বাঘা সিদ্দিকী।” এমন উদ্দীপনায় সংবা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে রোমকূপ খাঁড়া হয়ে যেত। বাংলাদেশ মিশন ও সারা স্বাধীনতাকামী ছাড়াও ভারতের সকলেরই নজর ছিল আকাশবাণী কলকাতা। একসময় মনে হতো আমরা সবাই মুক্তি যোদ্ধা। স্নান, খাওযার সময় নেই। শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে তখন খুলনা নিবাস বলে একটি বিশাল বাড়ি ছিল।সেটি তখন বাংলাদেশীদের ভিড়ে ঠাসা। একটি ছোট রুম নিয়ে আমিও থাকতাম। আমি ফিরে এলেই সকলের চোখে মুখে উৎকণ্ঠা “ভাইজান কোন খবর আছে? কবে যাইতে পারুম দ্যাশে”?
একদিন দেবদুলাল বাবুকে নিয়ে গেলাম প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী বনশ্রী সেনগুপ্তর কাছে। একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে বনশ্রী দেবী গাইলেন,”আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” ও ” ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” গান দুটি। মন ভরে উঠেছিল।
কে এই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়?
ছোটবেলায় থাকতেন শান্তিপুরে। পরিবারে ব্যাপক অর্থকষ্ট | ছোট ছেলেটি বুঝল কাজে না ঢুকলে পরিবারের হাল ফেরানো অসম্ভব | পড়াশোনা ছেড়ে পাড়ি দিলেন কলকাতা | উঠলেন হ্যারিসন রোডের একটি মেসে। ওই মেসে ছেলেটির সঙ্গে থাকতেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। রোজগারের জন্য তখন যা পেতেন তাই করতেন। চায়ের দোকানের কাজ। রেল কোম্পানির হয়ে সার্ভে। অর্থকষ্ট এতটাই ভয়াবহ ছিল। তবে সৃষ্টিশীল মনটা তাতেও হারিয়ে যায়নি | সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে রাতে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা লিখেছেন |
তিনি শিল্পী দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় | ১৯৬০ সাল | সুধীন দাশগুপ্তই দেবদুলালবাবুকে আকাশবাণীর ‘অনুষ্ঠান ঘোষক’-এর পদে চাকরির কথা বলেন। পরীক্ষা দিয়ে ঢুকেছিলেন। তারপর একটানা বত্রিশ বছর আকাশবাণীর সংসারে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
খবর পড়ায় একটা আলাদা ঘরাণা তৈরি করেছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘ কলকাতার আকাশবাণীতে ‘‘আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়’’—ভরাট কণ্ঠের এই সম্ভাষণ আজও বাঙালির হৃদয়ে | সংবাদ পাঠকে তিনি এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, ঘরে ঘরে সংবাদ পরিক্রমা শোনার জন্য রেডিও খোলা হতো।
দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেডিয়ো-জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনা সম্ভবত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্প্রচারটি। ১৯৬৬ সাল থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা চলে আসতেন কলকাতায়। তাঁরা সোজা গিয়ে দেখা করতেন আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগে। শোনাতেন নিজেদের অসহায় জীবনের নানা কাহিনী |
আকাশবাণীর ‘সংবাদ পরিক্রমা’-র লেখক প্রণবেশ সেন আর সংবাদ পাঠক দেবদুলালকে সেই সব কাহিনী অসম্ভব বিচলিত করেছিল।
প্রতিদিন রাত দশটা থেকে দশটা পাঁচ মিনিট দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় পড়তে লাগলেন যুদ্ধের কথা। যন্ত্রণার ইতিহাস। যাঁরা রেডিয়োর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তাঁরা তো বটেই শ্রোতারাও জানেন কী প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়েছিল সে অনুষ্ঠান।
১৯৭২ সালে এই সংবাদ পাঠের জন্যই পদ্মশ্রী উপাধি পান দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন –
আকাশবাণীর খবর পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারিনি। মনে হতো, আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন আমার বুকের ভেতরের সব লুকানো আবেগ আর উত্তেজনা ঢেলে দিয়েছিলাম আকাশবাণীর সংবাদ, সংবাদ-পরিক্রমা বা সংবাদ-সমীক্ষা পড়তে গিয়ে। রণাঙ্গনের খবর যখন পড়তাম, তখন মনে করতাম, আমিও সেই রণাঙ্গনের সৈনিক, যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কথা পড়তাম, তখন আমার মনের সমস্ত উল্লাস উচ্ছ্বাস নেমে আসতো আমার কণ্ঠজুড়ে। যখন করুণ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পড়তাম, তখন কান্নায় জড়িয়ে আসত গলা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকটায় যেন নেশায় পেয়ে বসেছিল আমাকে। উত্তেজনা আর প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, কখন পড়বো বাঙলাদেশের খবর। এই খবর পড়ার জন্য কখনো কখনো রাতে বাড়িও ফিরিনি। রাত কাটিয়েছি আকাশবাণী ভবনে। ভোরের খবর পড়তে হবে যে!
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।
১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি  একটি অনুষ্ঠানে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর অসামান্য সংবাদপাঠের জন্যে  বুকে জুড়িয়ে ধরেন।
বাংলাদেশের মুক্তিসেনারা তাঁর নাম দিয়েছিলেন,  ” বাংলার দুলাল” |
সারা ভারতে এখনও পর্যন্ত যে তিনজন ব্রডকাস্টার পদ্মশ্রী পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
আজ দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের প্রয়াণদিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি |

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু বার্ষিকী আজ

আপডেট সময় : ০৭:১৯:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ জুন ২০২৪
মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদায়ী সংবাদপাঠে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ..!
মানস বন্দ্যোপাধ্যায়,ভারত।।
১৯৭০ ও ১৯৭১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলি আজও মনে পড়ে। আমি একাধারে ছিলাম বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেষ কামাল, আওয়ামী লীগের প্রচার সচিব ঝন্টু সাহা ও এদিকে স্বনামধন্য সাংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
সারা পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন দখল করলেও পাকিস্তানি শাসক দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয় নি। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনের সময় বর্বর পাকিস্তানি সেনা বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অনেককে শহীদ করার পরই স্বাধনতার বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল। সেই বীজ থেকে গাছ মহীরুহী হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। বঞ্চনার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। অত্যাচারী পাকিস্তান বুলডোজার চালিয়ে হত্যা, গনধর্ষণ শুরু করলে কোটি কোটি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরায় চলে আসে। গর্জে ওঠে এপারের বাঙালিরাও। তারা আশ্রিতদের নিজেদের আত্মীয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন। চরম অত্যাচারের প্রতিবাদে ভারতের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সামরিক অভিযান চালান স্বাধীনতাকামীদের স্বার্থে। জয় বাংলা ধ্বনিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তি যোদ্ধারাও।
আকাশবাণী কলকাতা তখন সকলের আকর্ষণ বিন্দু। প্রতি মুহূর্তের রোমহর্ষক খবর দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও গোপনে একটি রেডিও আত্না প্রকাশ করে “রেডিও বাংলাদেশ” নামে আশু ঘোষের বাড়িতে। আমার তখন ঘনঘন যাতায়াত পার্ক সার্কাসে বাংলাদেশ মিশনে শেখ কামাল, ঝন্টু সাহা ও আকাশবাণী তে দেবদুলালের যাচ্ছে।
সেই উদাত্ত কণ্ঠে সংবাদ” আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। আজকের বিশেষ বিশেষ খবর হলো দুর্বার গতিতে ভারতীয় সেনা যশোর ক্যান্টনমেন্ট দখল করে এগিয়ে চলেছে। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর শহরে দুর্দান্ত লড়াইয়ে পাক সেনা লাহোর ছেড়ে পালিয়েছে। মুক্তি যোদ্ধারা বেশ কটি সেতু বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। নেতৃত্বে রয়েছেন বাঘা সিদ্দিকী।” এমন উদ্দীপনায় সংবা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে রোমকূপ খাঁড়া হয়ে যেত। বাংলাদেশ মিশন ও সারা স্বাধীনতাকামী ছাড়াও ভারতের সকলেরই নজর ছিল আকাশবাণী কলকাতা। একসময় মনে হতো আমরা সবাই মুক্তি যোদ্ধা। স্নান, খাওযার সময় নেই। শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে তখন খুলনা নিবাস বলে একটি বিশাল বাড়ি ছিল।সেটি তখন বাংলাদেশীদের ভিড়ে ঠাসা। একটি ছোট রুম নিয়ে আমিও থাকতাম। আমি ফিরে এলেই সকলের চোখে মুখে উৎকণ্ঠা “ভাইজান কোন খবর আছে? কবে যাইতে পারুম দ্যাশে”?
একদিন দেবদুলাল বাবুকে নিয়ে গেলাম প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী বনশ্রী সেনগুপ্তর কাছে। একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে বনশ্রী দেবী গাইলেন,”আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” ও ” ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” গান দুটি। মন ভরে উঠেছিল।
কে এই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়?
ছোটবেলায় থাকতেন শান্তিপুরে। পরিবারে ব্যাপক অর্থকষ্ট | ছোট ছেলেটি বুঝল কাজে না ঢুকলে পরিবারের হাল ফেরানো অসম্ভব | পড়াশোনা ছেড়ে পাড়ি দিলেন কলকাতা | উঠলেন হ্যারিসন রোডের একটি মেসে। ওই মেসে ছেলেটির সঙ্গে থাকতেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। রোজগারের জন্য তখন যা পেতেন তাই করতেন। চায়ের দোকানের কাজ। রেল কোম্পানির হয়ে সার্ভে। অর্থকষ্ট এতটাই ভয়াবহ ছিল। তবে সৃষ্টিশীল মনটা তাতেও হারিয়ে যায়নি | সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে রাতে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা লিখেছেন |
তিনি শিল্পী দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় | ১৯৬০ সাল | সুধীন দাশগুপ্তই দেবদুলালবাবুকে আকাশবাণীর ‘অনুষ্ঠান ঘোষক’-এর পদে চাকরির কথা বলেন। পরীক্ষা দিয়ে ঢুকেছিলেন। তারপর একটানা বত্রিশ বছর আকাশবাণীর সংসারে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
খবর পড়ায় একটা আলাদা ঘরাণা তৈরি করেছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘ কলকাতার আকাশবাণীতে ‘‘আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়’’—ভরাট কণ্ঠের এই সম্ভাষণ আজও বাঙালির হৃদয়ে | সংবাদ পাঠকে তিনি এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, ঘরে ঘরে সংবাদ পরিক্রমা শোনার জন্য রেডিও খোলা হতো।
দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেডিয়ো-জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনা সম্ভবত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্প্রচারটি। ১৯৬৬ সাল থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা চলে আসতেন কলকাতায়। তাঁরা সোজা গিয়ে দেখা করতেন আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগে। শোনাতেন নিজেদের অসহায় জীবনের নানা কাহিনী |
আকাশবাণীর ‘সংবাদ পরিক্রমা’-র লেখক প্রণবেশ সেন আর সংবাদ পাঠক দেবদুলালকে সেই সব কাহিনী অসম্ভব বিচলিত করেছিল।
প্রতিদিন রাত দশটা থেকে দশটা পাঁচ মিনিট দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় পড়তে লাগলেন যুদ্ধের কথা। যন্ত্রণার ইতিহাস। যাঁরা রেডিয়োর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তাঁরা তো বটেই শ্রোতারাও জানেন কী প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়েছিল সে অনুষ্ঠান।
১৯৭২ সালে এই সংবাদ পাঠের জন্যই পদ্মশ্রী উপাধি পান দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন –
আকাশবাণীর খবর পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারিনি। মনে হতো, আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন আমার বুকের ভেতরের সব লুকানো আবেগ আর উত্তেজনা ঢেলে দিয়েছিলাম আকাশবাণীর সংবাদ, সংবাদ-পরিক্রমা বা সংবাদ-সমীক্ষা পড়তে গিয়ে। রণাঙ্গনের খবর যখন পড়তাম, তখন মনে করতাম, আমিও সেই রণাঙ্গনের সৈনিক, যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কথা পড়তাম, তখন আমার মনের সমস্ত উল্লাস উচ্ছ্বাস নেমে আসতো আমার কণ্ঠজুড়ে। যখন করুণ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পড়তাম, তখন কান্নায় জড়িয়ে আসত গলা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকটায় যেন নেশায় পেয়ে বসেছিল আমাকে। উত্তেজনা আর প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, কখন পড়বো বাঙলাদেশের খবর। এই খবর পড়ার জন্য কখনো কখনো রাতে বাড়িও ফিরিনি। রাত কাটিয়েছি আকাশবাণী ভবনে। ভোরের খবর পড়তে হবে যে!
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।
১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি  একটি অনুষ্ঠানে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর অসামান্য সংবাদপাঠের জন্যে  বুকে জুড়িয়ে ধরেন।
বাংলাদেশের মুক্তিসেনারা তাঁর নাম দিয়েছিলেন,  ” বাংলার দুলাল” |
সারা ভারতে এখনও পর্যন্ত যে তিনজন ব্রডকাস্টার পদ্মশ্রী পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
আজ দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের প্রয়াণদিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি |