বিশেষ প্রতিনিধি।।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলীতে আধিপত্য বিস্তার ও ইটভাটার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে স্থানীয় আওয়ামীলীগ-বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে ১ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১০জন আহতের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুর বারোটার দিকে বক্তাবলী ইউনিয়নের আকবরনগর গ্রামে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী।
জানা গেছে, বিকেল ছয়টার দিকে দুপক্ষের লোকজন দুইদিকে অবস্থানে রয়েছেন জানিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যও মোতায়েন রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বক্তাবলী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কর্মী ছামেদ আলী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদের অনুসারী নেতা-কর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ বাঁধে।
স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তার ও ধলেশ্বরী নদীর তীরের ইটভাটায় শ্রমিক ও মাটি সরবরাহের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে পূর্বে থেকেই বিরোধ চলছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে আকবনগরের পাশের গ্রাম চরবক্তাবলী এলাকায় ইউনিয়ন কৃষক দলের উদ্যোগে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজবিরোধী মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় অতিথি হিসেবে ছিলেন হালিম আজাদসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। সভা শেষে রান্না করা খিচুড়িও খান নেতা-কর্মীরা।
পরে দুপুরে অনুসারীদের নিয়ে আকবরনগর গ্রামে আওয়ামীলীগ নেতা ছামেদ আলীর বাড়ির সামনে মহড়া দেন হালিম। এ সময় ছামেদ আলীর লোকজনের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে।
এই ঘটনায় সংঘর্ষে ছামেদ আলীর ছোটছেলে মো. হৃদয় (২৬) গুলিবিদ্ধ হলে তাকে নারায়ণগঞ্জ ৩’শ শয্যা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান এ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অপু কুমার সাহা।
একই হাসপাতালে বক্তাবলীর আলাউদ্দিন শেখের ছেলে রাজু শেখ (৩০) নামে আরেক যুবকের পায়ে দু’টো টেঁটাবিদ্ধ অবস্থায়, তাকেও ঢামেকে পাঠানো হয় বলে জানান চিকিৎসক।
এছাড়াও, আকবরনগরের শামসুল (৩২) ও মধ্যনগরের সৌরভসহ (২৮) অন্তত দশজন এ ঘটনায় আহত হয়েছেন। তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
হাসপাতালে আহত একজন সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা বিএনপির লোক। এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ লোকজন মিটিং-মিছিল করতেছে, আমাদের বাড়িঘরে হামলা করতেছে। ইটভাটাগুলো সব দখল করে রেখেছে সামেদ আলী ও তাদের লোকজন। আমরা এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা দরকার, এইসব বলছি দেইখা তারা আমাদের উপর হামলা করছে।”
অন্যদিকে, বাসা থেকে বেরিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাবার পথে বিএনপি নেতা হালিম আজাদের লোকজনের হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন হৃদয়। “পূর্ব-শত্রুতার জের ধরে আমাদের উপর হালিম হামলা করছে। তার দলবল এলোপাথারি গুলি করছে,” অভিযোগ করেন হৃদয়।
তবে, বিএনপি নেতা হালিম আজাদ বলেন, “মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের কৃষক দলের প্রোগ্রাম ছিল। প্রোগ্রাম শেষে যাবার পথে সামেদ আলীর লোকজন আমাদের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা চালায়। সামেদ আলী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা, বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি, তারপরও তাদের লোকজন ইটভাটাগুলোতে চাঁদাবাজি করে বেড়ায়। আমরা চাঁদাবাজি বন্ধের পক্ষে। আমরা কোনো হামলার পক্ষে না।”
বিএনপি নেতা হালিম আজাদের বিরুদ্ধে গত ২৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা-কর্মীদের উপর হামলারও অভিযোগ ওঠে। পরদিন ফতুল্লা মডেল থানায় এই ঘটনায় থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলাও হয়।
এদিকে, শনিবার সংঘর্ষের ঘটনার পর দুপুর তিনটার দিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সামেদ আলীর বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
সামেদ আলী বলেন, “আমি আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানের লগে আগে ছিলাম। কিন্তু কোনো পদ-পদবী ছিল না। আগস্টের পর আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য সব দখল করছে বিএনপির লোকজন। আমার স্ত্রী ছাড়া বাড়িতে কেউ থাকে না। আমাগো সরাইয়া দিয়া সবকিছুর দখল নিতে চায় হালিম ও তার লোকজন।”
স্থানীয়রা বলেন, ৭১ বয়সী সামেদ আলী আকবরনগরে দুর্ধর্ষ হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের আমলে সামেদ আলী ও তার লোকজন আধিপত্যের দ্বন্দ্বে বেশ কয়েকবার প্রতিপক্ষের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। সামেদ আলীর বিরুদ্ধে থানায় হত্যাসহ কয়েকটি মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ৬টা ২০ মিনিটে আকবরনগরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয় বলে জানিয়েছেন সেখানে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (‘ক’ সার্কেল) শামীম হোসাইন। তিনি বলেন, “সংঘর্ষের ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার ও কিছু টেঁটা জব্দ করেছি। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।”