অনলাইন নিউজ ডেস্ক।।
ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খের ধ্বনি, ধূপের ধোঁয়া আর প্রদীপের আলোয় মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ থেকে মণ্ডপ। শিল্পীর নিপুণ হাতের স্পর্শে মৃণ্ময়ী প্রতিমায় ফুটে ওঠে দেবী দুর্গার অপরূপ রূপ। স্নিগ্ধ প্রশান্তি, চোখে অপার মমতাময়ী দীপ্তি, দশ হাতে অস্ত্র, পদতলে পরাজিত মহিষাসুর; পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। কোথাও দেবীর মুখে মাতৃস্নেহের কোমলতা, কোথাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অটল প্রতিজ্ঞা। ভক্তরা অঞ্জলি দেন, পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করেন, ধুনুচির ধোঁয়া বাতাসে পাক খেয়ে ওঠে, আর ঢাকের তালে তালে মানুষের হৃদয় আনন্দে ও আবেগে আন্দোলিত হয়।
পূজা মণ্ডপের এই দৃশ্য কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের সৌন্দর্য নয়; এর গভীরে রয়েছে মানুষের চিরন্তন আশ্রয়, শুভশক্তির প্রতি বিশ্বাস এবং মাতৃস্নেহের এক অনির্বচনীয় আকুলতা। তাই দেবী দুর্গাকে আমরা শুধু দুর্গা বলে ডাকি না– ডাকি ‘মা’, বলি ‘জগজ্জননী’। এই মা সম্বোধনের মধ্যে নিহিত রয়েছে এক দার্শনিক উপলব্ধি। তা হলো–তিনি সৃষ্টির উৎস, জীবনের ধারক এবং ভক্তের আত্মিক আশ্রয়ের প্রতীক।
শাক্ত দর্শনে দেবীকে মহাশক্তির স্বরূপ হিসেবে দেখা হয়। সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের যে চিরন্তন প্রবাহের মধ্যে বিশ্বজগৎ আবর্তিত, দেবী সেই মহাশক্তিরই প্রকাশ। জগতের উদ্ভব, জীবনের ধারাবাহিকতা এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুনের আবির্ভাব–সবকিছুর মধ্যে ভক্ত দেবীর শক্তির প্রকাশ উপলব্ধি করেন।
তাই দুর্গাপূজার প্রতিমায় আমরা যে মায়ের মুখ দেখি, তা শুধু মাটির তৈরি একটি শিল্পরূপ নয়; ভক্তের কাছে সেই মৃণ্ময়ী রূপ চিন্ময়ী শক্তিকে অনুভব করার মাধ্যম হয়ে ওঠে। প্রতিমার মধ্য দিয়ে ভক্ত নিজের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আত্মিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। প্রতিমার চোখ আঁকার মুহূর্ত থেকে শুরু করে প্রাণপ্রতিষ্ঠা, মন্ত্রোচ্চারণ, অঞ্জলি ও আরতির মধ্য দিয়ে ভক্তের চেতনায় দেবী ক্রমে হয়ে ওঠেন জীবন্ত মাতৃসত্তা। ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রতিমাপূজার তাৎপর্য শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মৃণ্ময়ী রূপের মধ্য দিয়ে চিন্ময়ী শক্তিকে অনুভব করা এবং তার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
সংগৃহীত;