তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি।।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগানে কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন দেশি-বিদেশি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধি দল।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) চায়ের-রাজ্যে অধ্যুষিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুষ্ঠ রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসার আওতায় আনা, রোগীদের বর্তমান অবস্থা এবং কুষ্ঠ প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে চলমান কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে পরিদর্শন করা হয়।
প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান, টিবি ও লেপ্রসি কার্যক্রমের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি এবং ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও এনজিও প্রতিনিধিরা।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগানে কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসাসেবা, রোগ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া, নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আনা, বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং রোগজনিত শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সময় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন তারা।
কুষ্ঠ রোগীদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন সদস্যরা। রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় মতবিনিময় করেন।
টিবি ও লেপ্রসি কার্যক্রমের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, কুষ্ঠ নির্মূলে শুধু রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া যথেষ্ট নয়। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা, প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ এবং রোগীদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য কমানোর বিষয়গুলো বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ের বাস্তবচিত্র পর্যালোচনা করে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সিলেট বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, চা-বাগান এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দৌড় গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কুষ্ঠ রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত দেখাশোনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এ রোগটি মানুষের মধ্যে থাকা ভয় ও ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য সহকারী বাঁধন আচার্য্যের দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতায় তিনি সন্তুষ্ট। মাঠপর্যায়ে কুষ্ঠ নিয়ে তাঁর থেকে অন্য স্বাস্থ্য সহকারীদেরও অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, প্রান্তিক ও চা-বাগান এলাকার জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি স্থানীয় অংশীদারদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কুষ্ঠ রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বারোপ ভাবে দেখতে হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, চা-বাগান এলাকায় কুষ্ঠ রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে। রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় রাখা, জটিলতা প্রতিরোধ এবং সচেতনতা তৈরিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. বিশ্বজিৎ দেব, সিনিয়র স্টাফ নার্স হাছিনা আক্তার, সহকারী সার্জন ডা. সুভাষ দেবনাথ স্নিগ্ধ, সহকারী সার্জন ডা. অনির্বাণ দেব, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) ডা. আকাশ নুনিয়া, হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট মো. নুর আলম কয়েছ, উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর বিনয় সিং রাউতিয়া সহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্যান্য কর্মকর্তা, কর্মচারীরা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কুষ্ঠ নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাপানের সাসাকাওয়া হেলথ ফাউন্ডেশনের (SHF) সহযোগিতায় ‘Joint Monitoring Mission on Leprosy in Bangladesh 2026’ বা জেএমএম ২০২৬ পরিচালিত হচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে কুষ্ঠমুক্ত করার লক্ষ্যে অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।