ফরহাদ রহমান,
টেকনাফ প্রতিনিধি।।
বঙ্গোপসাগর, নাফ নদী, পাহাড়, পাথুরে সৈকত ও সবুজ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কক্সবাজারের টেকনাফ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ জনপদে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং জিরো পয়েন্ট, জাহাজপুরা, গর্জন বাগান, ঘুদার বিল বিচ, লেঙ্গুর বিল বিচ, কচ্ছপিয়া, বরডেল পাথর বিচ ও শাপলাপুরের সাবেক মেজর সিনহা চত্বরসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এসব পর্যটন স্পটকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্ভাবনাময় এসব স্থানকে পর্যটনবান্ধব করে তুলতে অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, স্যানিটেশন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে রয়েছে নানা ঘাটতি।
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী কামাল বলেন, “পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেরও উন্নতি হবে। আমরা শাহপরীর দ্বীপকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট পর্যটন নগরী হিসেবে দেখতে চাই। এ জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি।”
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান ফারিহা ইয়াসমিন বলেন, “শাহপরীর দ্বীপসংলগ্ন নাফ নদীর ওপর থাকা জেটিটির অবস্থা ভালো নয়। পর্যটকদের রাতযাপনের জন্যও পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা নেই। সাবরাং জিরো পয়েন্ট থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত ও সড়ক সংস্কার করা হলে এ অঞ্চলের পর্যটন আরও বিকশিত হবে।”
সাবরাং জিরো পয়েন্টের ব্যবসায়ী ও পর্যটন উদ্যোক্তা আব্দুল মতালব বলেন, “জিরো পয়েন্টের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সাগরের দৃশ্য অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু এখানে পর্যাপ্ত আবাসন ও শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। ফলে পর্যটকরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারেন না। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।”
পরিবেশের বিষয়ে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, “টেকনাফের উপকূলীয় এলাকা ১৯৯৯ সালে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ এলাকায় লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন ধরনের জীববৈচিত্র্য রয়েছে। শীত মৌসুমে সামুদ্রিক কচ্ছপও এসে ডিম পাড়ে। তাই পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদেরও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে হবে।”
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা সবসময় গুরুত্বের সঙ্গে দেখে থাকি। শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় আমাদের একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা দিন-রাত দায়িত্ব পালন করছেন। পর্যটকরা যাতে নিরাপদে টেকনাফের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সবসময় সোচ্চার রয়েছি।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস, এম, অনিক চৌধুরী বলেন, “টেকনাফের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শাহপরীর দ্বীপ থেকে শাপলাপুর পর্যন্ত পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোকে পরিকল্পিত ও স্মার্ট পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকার যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করবে, উপজেলা প্রশাসন সেগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে ও নির্বিঘ্নে কাজ করে যাবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, টেকনাফের সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলোকে একটি সমন্বিত পর্যটন রুটের আওতায় আনা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ টেকনাফের উপকূলীয় অঞ্চলকে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের পর্যটন মানচিত্রে নতুন আকর্ষণ হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।