বিশেষ প্রতিবেদক।।
নারায়ণগঞ্জ নগরীর ব্যস্ত সড়ক, উদ্যান ও দোকানের সামনে কালো রঙের লম্বা কুর্তা, পায়জামা ও টুপি পরে ‘আফগানি বেশে’ খেলনা বন্দুক হাতে টিকটক ভিডিও তৈরি করা দুই তরুণকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে দশটার দিকে শহরের ২নং রেল গেইট এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয় বলে জানান সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান।
পরে শনিবার(২৯ আগষ্ট) সকালে তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এর ৪ ধারায় মামলা দায়ের করেন সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাখাওয়াত হোসেন।
এ মামলার পর তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে জানান আদালত পুলিশের পরিদর্শক আব্দুস সামাদ।
জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত দুই তরুণ হলেন, বন্দর উপজেলার আমিন আবাসিক এলাকার শামীম আহম্মেদের ছেলে মো. লিমন তোহা (২২) ও একই এলাকার স্বপন মোল্লার ছেলে মো. ইয়াছিন মোল্লা (২৩)।
প্রসঙ্গত,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, লিমন ও ইয়াসিন খেলনার বন্দুক হাতে শহরের উদ্যান, সড়ক ও দোকানের সামনে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের দেখে পথচারী, রিকশাচালক ও শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। তাদের পরনে কালো কুর্তা-পায়জামা ও মাথায় টুপি দেখা যায়।
এসব ভিডিও লিমন তার নিজের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক একাউন্টে প্রকাশ করেন। একটি ভিডিওতে ভারতের একটি সিনেমার ‘আফগান জালেবি’ গানও ব্যবহার করেন তারা।
লিমনের পরিবারের সদস্যরা ভিডিওগুলোকে নিছক ‘সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট’ হিসেবে দাবি করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটিকে কেউ কেউ ‘দেশে অস্ত্রের অবাধ বিস্তারের’ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে স্ট্যাটাস দেন।
বিষয়টি জেলার সাংবাদিকদের নজরে আসলে এ নিয়ে শুক্রবার একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত কারা হলে, পরবর্তীতে বিষয়টি নজরে আসে পুলিশের। খোঁজ করে ভিডিওতে থাকা ওই দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শনিবার বিকেলে এ নিয়ে, এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জেলা পুলিশ জানিয়েছে, গত ২৮ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বন্দুক হাতে দুই তরুণের ঘুরে বেড়ানোর’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওটি নগরীর নারায়ণগঞ্জ সিটি পার্কে (আগে নাম ছিল- শেখ রাসেল নগর পার্ক) ধারণ করা হয়েছিল। বিষয়টি নজরে আসায় জেলা পুলিশের তথ্য ও প্রযুক্তি ইউনিট কাজ শুরু করে এবং দুই তরুণকে শনাক্ত করে।
“গ্রেপ্তার আসামিরা শটগান ও এসএমজি সদৃশ দু’টি প্ল্যাস্টিকের বন্দুক হাতে মহড়া দিয়ে জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। বিনোদনের নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, পথচারী ও শিশুদের ভয় দেখানো এবং সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
খেলনা অস্ত্র হলেও এর মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা গুরুতর অপরাধ। এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা মামলা করা হয়েছে,” বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানায় জেলা পুলিশ।
তবে, মুঠোফোনে এ ঘটনার বিষয়ে লিমনের মা লাইজু আক্তার বলেন, তার ছেলে লিমন এবং ১৪ বছর কিশোরী মেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরি করেন। অন্তত দশদিন আগে বন্দুক হাতে ওই ভিডিওটি নিছক ‘প্রাঙ্ক’ হিসেবে করা হয়েছিল। ভিডিওটি করতে সহযোগিতা করতো তার বন্ধু ইয়াসিন। বিষয়টি এতদূর গড়াবে তা তারা বুঝতে পারেননি।
লিমন ২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জ কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর কোথাও আর ভর্তি হননি। তার বাবা বন্দরের একটি ডকইয়ার্ডের সহযোগী (হেল্পার) হিসেবে কাজ করেন। পরিবারটি বন্দরের আমিন হাউজিং এ ভাড়াবাসায় থাকেন।
“আমাদের রাতে ফোন দিয়ে থানায় ডাকা হয়। পরে আমরা জানতে পারি, খেলনা বন্দুক নিয়ে ভিডিও করলেও তা বেআইনি। কিন্তু এইটা তো ওরা মজার ছলে করেছে। আমরা সাধারণ পরিবারের লোকজন। এতকিছু বুঝি না। বাইরের দেশে এই ধরনের ভিডিও করে, ওইটা দেখে আমার ছেলেও করেছিল। কিন্তু এখন তো ওর ভবিষ্যত নিয়ে আমরা টেনশনে আছি,” বলেন লিমনের মা লাইজু।
