ছবি : সাদিয়া ইসলাম ইরা,আয়ারল্যান্ড
আজকের পৃথিবীতে কবির পাশে বসে কবিতা লিখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। শিল্পীর তুলির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে অ্যালগরিদম। কেউ মিউজিক তৈরি করছে, কেউ বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট লিখছে, আবার কেউ সংবাদ বিশ্লেষণও করছে নিখুঁতভাবে। প্রশ্ন উঠছে—যদি মেশিনও সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে মানুষের সৃজনশীলতার বিশেষত্ব কোথায়?
একসময় ভাবা হতো, সৃজনশীলতা এমন এক গুণ যা শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে নিহিত। মানুষ অনুভব করে, কল্পনা করে, তারপর সেই অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় শিল্প, সাহিত্য বা বিজ্ঞানচিন্তায়। কিন্তু এআই এসে যেন সেই ধারণায় এক বড় প্রশ্নচিহ্ন টেনে দিয়েছে।
ChatGPT, DALL·E, Midjourney বা অন্যান্য জেনারেটিভ মডেল এখন এমন সব লেখা ও ছবি তৈরি করছে, যা দেখলে বোঝা যায় না, সেটি মানুষ বানিয়েছে নাকি মেশিন।
তবুও, যদি গভীরভাবে দেখা যায়, এআই-এর এই “সৃজনশীলতা” আসলে মানুষেরই প্রতিফলন। কারণ এই প্রযুক্তিকে তৈরি করেছে মানুষই—মানুষের অভিজ্ঞতা, ভাষা, যুক্তি ও কল্পনাশক্তির বিপুল ডেটা দিয়েই এটি শেখে। অর্থাৎ, এআই যা তৈরি করছে, তা মানব মস্তিষ্কের এক বিস্তৃত প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছু নয়।
তাহলে মানুষের ভূমিকা কী?
মানুষের সৃজনশীলতা এখন নতুন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। আগে যেখানে সৃজনশীলতা মানে ছিল কিছু “নতুন বানানো”, এখন সেটি মানে হয়েছে “অর্থপূর্ণ সৃষ্টি করা।” মেশিন যতই ছবি আঁকুক বা গল্প লিখুক, সেটিতে অভিজ্ঞতার অনুভূতি থাকবে না। মানুষ যখন একটি কবিতা লেখে, সেখানে তার ব্যথা, স্মৃতি, আশাভঙ্গের সুর থাকে—যা অ্যালগরিদমের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়।
এআই-কে তাই প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে দেখা উচিত। একজন লেখক এখন এআই-এর সাহায্যে নতুন আইডিয়া পেতে পারেন, শিল্পী রঙের সমন্বয়ে পরীক্ষা করতে পারেন, গবেষক তথ্য বিশ্লেষণকে দ্রুততর করতে পারেন। এআই মানুষের কাজকে ছিনিয়ে নিচ্ছে না, বরং তার ভাবনার পরিসর বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে উদ্বেগও অমূলক নয়। যেভাবে প্রযুক্তি দ্রুত এগোচ্ছে, অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে হয়তো “মানুষের তৈরি” এবং “মেশিনের তৈরি” শিল্পের পার্থক্যই বোঝা যাবে না। তখন কি শিল্পের মূল্য কমে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে “মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
যে শিল্প বা লেখা মানুষকে ভাবায়, নাড়া দেয়, সেই সৃষ্টিই সত্যিকার অর্থে মূল্যবান থাকবে—যে মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন।
সৃজনশীলতার সংজ্ঞা তাই আজ বদলে যাচ্ছে। আগে আমরা বলতাম, “সৃষ্টিশীল মানে যিনি কিছু বানাতে পারেন।” এখন বলা যায়, “সৃষ্টিশীল মানে যিনি নতুনভাবে ভাবতে পারেন।” প্রযুক্তি আমাদের হাতিয়ার, কিন্তু ভাবনাটি এখনো কেবল মানুষের।
অতএব, এআই যুগে মানুষের সৃজনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে না; বরং নতুন অর্থে পুনর্জন্ম নিচ্ছে। যে মানুষ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে আরও বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করতে পারবে, সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ আসলে তারই হাতে।
শেষমেশ, আমরা হয়তো এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি—যেখানে শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞান মিলেমিশে মানুষের কল্পনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এআই শুধু সহায়ক হবে, সৃষ্টিশীলতার মূল উৎস নয়। কারণ, মেশিনের আছে জ্ঞান, কিন্তু নেই চেতনা। আর সৃষ্টিশীলতার আসল জন্ম হয় ঠিক সেই চেতনাতেই।